
জীবন– অচেনা যাপন: সমাপ্তি
ড. বন্দনা চট্টোপাধ্যায়
(অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বেলদা কলেজ)
রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের সুবর্ণ যুগ বলতে যা বোঝায় তা মূলত শুরু হয়েছিল ‘সাধনা’ থেকে ‘ভারতী’ পর্ব পর্যন্ত। এই কালপর্বেরই ফসল হলো ‘সমাপ্তি’ গল্পটি।এটি ‘সাধনা’ পত্রিকায় আশ্বিন-কার্তিক (১৩০০ সালে) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এই গল্পের বীজ উপ্ত হয়েছিল ছিন্নপত্রাবলীর ২৬-সংখ্যক চিঠিতে, যেটি তিনি বাংলা ১২৯৮ সালে শাহজাদপুর থেকে ইন্দিরা দেবীকে লিখেছিলেন। পত্রটিতে দেখা যায় নদীর ঘাটে একটি বালিকা বধূ বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার বিদায়ের দৃশ্য: “অনেকগুলি পাকাচুল একত্র হয়েছে। কিন্তু ওদের মধ্যে একটা মেয়ে আছে, তার প্রতিই আমার মনোযোগটা সর্বাপেক্ষা আকৃষ্ট হচ্ছে। বোধ হয় বয়স বারো-তেরো হবে, কিন্তু একটু হৃষ্টপুষ্ট হওয়াতে চোদ্দ -পনেরো দেখাচ্ছে।
মুখখানি বেড়ে, বেশ কালো অথচ বেশ দেখতে। ছেলেদের মতো চুল ছাঁটা, তাতে মুখটি বেশ দেখাচ্ছে,… বিশেষত: আধা ছেলে আধা মেয়ের মতো হয়ে আরও একটু বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করে। ছেলেদের মতো আত্ম সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অচেতন ভাব এবং তার সঙ্গে মাধুরী মিশে ভারী নতুন রকমের একটি মেয়ে তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে যে এরকম ছাঁদের “জনপদবধূ” দেখা যাবে এমন প্রত্যাশা করি নি।” উক্ত গল্পে মৃন্ময়ীকেও এই রকমই বয়সে বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি যেতে হয়েছিল। এই গল্পে বাল্যবিবাহের সমস্যা নয়, বরং এক ‘নতুন রকমের জনপদবধূ’র খাপছাড়া গোছের বাল্যবিবাহকে কেন্দ্র করে গল্পকারের মনে দানা বেঁধেছিল একটা ভাবনা, তা হলো যৌবনকালের সমস্যা কেন্দ্রিক।
গল্পকার মৃন্ময়ীর সঠিক বয়সের হিসাব দেন নি, তবে তার দৈহিক গড়ন ও হাবভাবের যে বিবরণ তিনি দিয়েছেন তাতে বোঝা যায়, সে নিতান্ত বালিকা নয়, আবার যুবতীও নয়, অর্থাৎ সে বয়ঃসন্ধিকালের এক সন্ধিস্থলে দাঁড়িয়ে আছে। গল্পকারের বর্ণনায়: “মৃন্ময়ী দেখিতে শ্যামবর্ণ, ছোট কোঁকড়া চুল পিঠ পর্যন্ত পড়িয়াছে। ঠিক যেন বালকের মতো মুখের ভাব, মস্ত মস্ত দুটি কালো চক্ষুতে না আছে লজ্জা, না আছে ভয়,… শরীর দীর্ঘ পরিপুষ্ট সুস্থ সবল, কিন্তু তাহার বয়স অধিক কি অল্প সে প্রশ্ন কাহারও মনে উদয় হয় না।”
মৃন্ময়ীর স্বভাবের মধ্যে বয়ঃসন্ধিকালের প্রত্যেকটি সমস্যা বেশ নিপুণভাবে ধরা পড়েছে। ভয়ডরহীন ভাব, অপরিসীম কৌতূহল নিয়ে সে দেখছিল– “গ্রামে বিদেশী জমিদারের নৌকা কালক্রমে যেদিন ঘাটে আসিয়া লাগে সেদিন গ্রামের লোকেরা সম্ভ্রমে শশব্যস্ত হইয়া উঠে… কিন্তু মৃন্ময়ী কোথা হইতে একটা উলঙ্গ শিশুকে কোলে লইয়া কোঁকড়া চুলগুলি পিঠে ফেলাইয়া ছুটিয়া ঘাটে আসিয়া উপস্থিত”। মৃন্ময়ী যেন ব্যাধহীন দেশের হরিণ শিশুর মত দুচোখ ভরা কৌতূহল নিয়ে শুধুই দেখতে থাকে।
মৃন্ময়ীর সমবয়সী মেয়েদের থেকে ছেলেদের সঙ্গেই তার যত খেলা। তার এই স্বভাবের জন্য গ্রামের গৃহিণীরা সর্বদা ভীত, চিন্তিত। শিষ্টতা, সামাজিকতা তার মধ্যে তখনও জাগ্রত হয় নি।
গল্পের শুরুতে দেখা যায়, অপূর্ব দেশে ফেরার সময় নদীর ঘাটে পা পিছলে পড়ে গেলে আবেগপ্রবণ মৃন্ময়ী সশব্দে উচ্চকিত হয়ে হেসে ওঠে। মৃন্ময়ীর কাছে শ্রী
অপূর্বকৃষ্ণ রায় বি. এ. পাশ হলেও কোনরকম সম্ভ্রমের ধার সে ধারে নি, বরং তার জুতোজোড়া সরিয়ে রেখে তাকে হেনস্থা করতে চেয়েছে। অপূর্ব তার নতুন জুতোজোড়া না পেয়ে ঐ বাড়ির কর্তার ছেঁড়া জুতো পরে বাড়ি রওনা হয়। এতে মৃন্ময়ী হাস্যকলোচ্ছ্বাসে অপূর্বকে ব্যঙ্গের পাত্র করে তোলে।
গল্পের ঘূর্ণাবর্তে দেখা যায় অপূর্ব তার বিবাহের পাত্রী পছন্দের ক্ষেত্রে মৃন্ময়ীকেই পছন্দ করে। এতে তার মায়ের মত ছিল না, কিন্তু অপূর্ব মৃন্ময়ীকেই বিবাহ করার জন্য জেদ ধরে বসে। মৃন্ময়ী অবশ্যই এতে প্রথমে রাজী হতে চায় নি, পরে তাকেও রাজী হতে হয়। বিয়ের পরে শুরু হয় শ্বশুরবাড়ির শাসন। শ্বশুরবাড়িতে তার আচার-আচরণ হাবভাব কেমন হবে এ নিয়ে তার মা ও প্রতিবেশী গুরুজনেরা নানা জ্ঞান ও উপদেশ দেন। কিন্তু সে এসব থেকে মুক্তি চায়। এ বিষয়ে তার শাশুড়ি যেদিন তাকে কঠিনভাবে বলে, “দেখো বাছা, তুমি কিন্তু আর কচি খুকি নও। আমাদের ঘরে অমন বেহায়াপনা করিলে চলিবে না”, সেদিন বিকালে সে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায়। অবশেষে বিশ্বাসঘাতক রাখালের সাহায্যে রাধাকান্ত ঠাকুরের পরিত্যক্ত ভাড়া রথের মধ্যে তাকে খুঁজে পাওয়া যায়। মৃন্ময়ীর মনের পরিপূর্ণ বিকাশ তখনও হয়নি। তাই সে ঘরের মধ্যে থেকে মুক্তি পেতে ব্যর্থ চেষ্টা করে।
শ্বশুরবাড়ির শাসনে বদ্ধ মৃন্ময়ীর
মনে বন্ধনমুক্তির আকাঙ্ক্ষা জন্মেছে। গল্পকার মৃন্ময়ীর মনের অবস্থাকে পিঞ্জরাবদ্ধ পাখির সঙ্গে তুলনা করেছেন। মৃন্ময়ী পালানোর পরের দিন তার শাশুড়ি তাকে দরজা বন্ধ করে আটকে রাখলে গল্পকার মৃন্ময়ীর অবস্থা সম্বন্ধে লিখেছেন– “সে নূতন পিঞ্জরাবদ্ধ পাখির মত প্রথম অনেকক্ষণ ঘরের মধ্যে ধড়ফড় করিয়া বেড়াইতে লাগিল।” শ্বশুরবাড়ির শাসনের সমস্ত রাগ গিয়ে পরে অপূর্বর ওপর। তার মনে হয়েছে অপূর্ব তাকে বিয়ে করেছে বলেই আজ তার এই দুর্দশা। এরপরে মৃন্ময়ী দ্বিতীয়বার পালাতে চেষ্টা করেছে, ঠিক সেই সময়ই আসে তার বাবার চিঠি। পাঠক মাত্রেই অবগত আছেন যে মৃন্ময়ী তার বাবার বড় আদরের মেয়ে। কর্মক্ষেত্রে বাবা দূরে থাকে বলে মাও তাকে সেরকম শাসন করে না। এমতাবস্থায় মুক্তির আনন্দে সে দ্বিতীয়বার গভীর রাত্রে ঘরের বাইরে পা রাখার সাহস করে, যদিও সে বাবার কাছে যাওয়ার ঠিকানা জানে নি, তবুও মুক্তির অদম্য ইচ্ছাই তাকে ঘরের বাইরে বের করে। কিন্তু এবারও সে অসফল হয়। অকাতর ঘুমই তার জীবনে কাল হয়ে তাকে শ্বশুরবাড়িতে আবার ফিরিয়ে আনে। তবে, শেষে অপূর্বর সাহায্যেই মৃন্ময়ী বাবার কাছে পৌঁছতে পেরেছে।
(চলবে)
অয়মারম্ভ: শুভায় ভবতু। রূপসী বাংলা দিগন্তের যাত্রা শুরু হলো কর্ণধারের জনমদিবসে। হাঁটি হাঁটি পা পা করে এখন সে এগিয়ে চলুক সামনের দিকে।