কোন্ পুরাতন পাঠের টানে

1000227565

[আমাদের পত্রিকার এই শিরোনামে প্রকাশিত পাঠ্যাংশগুলি কমপক্ষে ১০০ বছরের পুরনো সাহিত্য থেকে উদ্ধৃতি হিসেবে তুলে ধরা হবে।– প্রধান সম্পাদক।

চর্যাপদ তথা বৌদ্ধ দোহাবলীর রচনাকাল মোটামুটি এক হাজার বছরের কিছু অধিক বলে গণ্য করা হয়। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে নেপালের রাজ দরবার থেকে উদ্ধারকৃত ও তাঁর দ্বারা সম্পাদিত ‘বৌদ্ধ গান ও দোহাবলী’-তে ২৪ জন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য বিরচিত যে সাড়ে ছেচল্লিশটি সাধনসংগীত সংকলন করেছেন, তাই বাংলা ভাষার তথা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন বলে পরিগণিত। কিন্তু প্রকৃত বিচারে বাংলা সাহিত্য বিস্তারের যথার্থ পরিচয় পাওয়া যায় চৈতন্যকেন্দ্রিক রচনাকাল থেকে, যার মোটামুটি বয়স ৫০০ বছর। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য (১৪৮৬-১৫৩৪) একজন যুগাবতার ও সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ছিলেন। তিনি একাধারে মহাপণ্ডিত, উদার ভক্তিবাদের প্রবর্তক, সমাজসংস্কারক যুগপুরুষ ছিলেন। তাঁর জীবনকেন্দ্রিক অনেক গ্রন্থ, নাটক, কড়চা ইত্যাদি তৎকালে প্রচলিত হয়েছিল। এইসব চৈতন্যকথার মধ্যে চৈতন্যমঙ্গল, চৈতন্যভাগবত, চৈতন্যচন্দ্রোদয় ইত্যাদি রয়েছে। তবে, চৈতন্যজীবনী হিসেবে শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত ‘চৈতন্যচরিতামৃত’। যেসব বিদগ্ধ বিদ্বজ্জনেরা চৈতন্যচরিতামৃত সম্পাদিত করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হলেন প্রখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ্ ও বাংলাসাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতা ডঃ সুকুমার সেন। তাঁর সম্পাদিত চৈতন্যচরিতামৃতের ‘লঘু সংস্করণ’ থেকে আমরা বর্তমান পাঠ্যাংশটি তুলে ধরছি।  –প্রধান সম্পাদক]

“জয় জয় শ্রী চৈতন্য জয় নিত্যানন্দ।জয়াদ্বৈতচন্দ্র জয় গৌর ভক্তবৃন্দ।।

এ তিন ঠাকুর গৌড়ীয়াকে করিয়াছে 

আত্মসাৎ। 

এ তিনের চরণ বন্দো তিনে মোর নাথ।।

গ্রন্থের আরম্ভে করি মঙ্গলাচরণ।

গুরু বৈষ্ণব ভগবান তিনের স্মরণ।।

তিনের স্মরণে হয় বিঘ্নবিনাশন।

অনায়াসে হয় নিজ বাঞ্ছিতপূরণ।।

সকল বৈষ্ণব শুন করি এক মন। 

চৈতন্যকৃষ্ণের শাস্ত্রমত নিরূপণ।। 

কৃষ্ণ গুরুদ্বয়* ভক্ত অবতার প্রকাশ।

শক্তি এই ছয় রূপে করেন বিলাস।।

মন্ত্রগুরু আর যত শিক্ষাগুরুগণ। 

তাঁহার চরণে আগে করিয়ে বন্দন।।

শ্রীরূপ সনাতন ভট্ট- রঘুনাথ ।

শ্রীজীব গোপাল-ভট্ট দাস-রঘুনাথ।।

এই ছয় গুরু শিক্ষাগুরু যে আমার।

তাঁ সবার পাদপদ্মে কোটি নমস্কার।। ভগবানের ভক্ত যত শ্রীবাস প্রধান।

তাঁ সবার  পাদপদ্মে সহস্র প্রণাম।। 

অদ্বৈত আচার্য প্রভুর অংশ-অবতার।

তাঁর পাদপদ্মে কোটি প্রণতি আমার।।

নিত্যানন্দ-রায়** প্রভুর স্বরূপপ্রকাশ।

তাঁর-পাদপদ্ম বন্দো যাঁর মুঞি দাস।।

গদাধর-পণ্ডিত আদি প্রভু নিজশক্তি।

তাঁ সবার চরণে মোর সহস্র প্রণতি।। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু স্বয়ং ভগবান। 

তাঁহার পদারবিন্দে অনন্ত প্রণাম।।

সাবরণে@ প্রভুরে করিয়া নমস্কার।

এই ছয়  তেঁহো যৈছে করিয়ে বিচার।।

যদ্যপি আমার গুরু চৈতন্যের দাস।

তথাপি জানিয়ে আমি তাঁহারি প্রকাশ।। গুরু কৃষ্ণরূপ হয়েন শাস্ত্রের প্রমাণে।

গুরুরূপে কৃষ্ণ কৃপা করেন ভক্তগণে।।

শিক্ষাগুরুকে ত জানি কৃষ্ণের স্বরূপ। অন্তর্যামী ভক্তশ্রেষ্ঠ এই দুই রূপ।।”

জীবে সাক্ষাৎ নাহি তাহে গুরু চৈত্ত্যরূপে@@

শিক্ষাগুরু হয়েন কৃষ্ণ মহান্ত-স্বরূপে।।

—————————–

* দীক্ষাগুরু ও শিক্ষাগুরু।

** প্রভু, গোসাঞি, ঠাকুর।

@আবরণ অর্থাৎ গুরুজন-পরিজন সমেত।

@@অন্তর্যামী জ্ঞানদাতা।

(আদিলীলা, প্রথম পরিচ্ছেদ। সাহিত্য অকাদেমি প্রকশিত)

2 thoughts on “কোন্ পুরাতন পাঠের টানে”

  1. তরুণ কুমার রাণা

    পুরাতনী বিভাগে বঙ্গীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রাচীন নিদর্শনগুলি তুলে ধরার এই প্রয়াস প্রশংসাযোগ্য।

Leave a Reply to তরুণ কুমার রাণা Cancel Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *